
আবেদ আলী: সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজের দর্পণ এবং জনস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি সংবাদ যেমন মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরতে পারে, তেমনি অসতর্কতা, যাচাই-বাছাইয়ের অভাব কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে একটি সংবাদ কারও সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারে। তাই সাংবাদিকতার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সংবাদটি কত দ্রুত প্রকাশ করা হলো, তার চেয়ে সংবাদটি কতটা সত্য ও দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করা হলো।
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে সংবাদ প্রকাশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুহূর্তেই একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক সময় তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত নীতিগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কাউকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেই তিনি অপরাধী—এমন সিদ্ধান্ত সংবাদ প্রতিবেদনে দেওয়া সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন অভিযুক্তকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন না করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ। তবে আদালতের রায়ে কেউ দণ্ডিত হলে সেটিও সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সাংবাদিকের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে সংবাদে ব্যবহৃত শব্দের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি। ‘অভিযুক্ত’, ‘আসামি’, ‘গ্রেপ্তার’, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’—প্রতিটি শব্দের আলাদা আইনগত অর্থ রয়েছে। শব্দের সামান্য ভুল প্রয়োগও পাঠকের কাছে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে।
সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা। অভিযোগের সংবাদ হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার আইনজীবীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া না গেলে সেটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা যেতে পারে। এতে সংবাদ আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়।
বর্তমান সময়ে ‘ভিউ’ ও ‘ক্লিক’ পাওয়ার প্রতিযোগিতাও সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চমকপ্রদ শিরোনাম, অতিরঞ্জিত ভাষা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে পাঠক আকর্ষণ করা সম্ভব হলেও এতে দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অতঃপর সাংবাদিকতা কোথায় দাঁড়াবে—এ প্রশ্নের উত্তর সাংবাদিকদের নিজেদেরই খুঁজতে হবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও অপরিহার্য। সত্য যাচাই, নিরপেক্ষতা, মানবিকতা, তথ্যের সঠিক ব্যবহার এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে একজন সাংবাদিকের প্রধান নীতি।
কারণ একটি সংবাদ প্রকাশের পর তা শুধু একটি ওয়েবসাইটের পাতায় পড়ে থাকে না; সেটি মানুষের চিন্তা, সমাজের ধারণা এবং কখনো কখনো একজন মানুষের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলে।