
রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে গত চার বছরে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ব্যয় ও বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৫৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৮৬ কোটি ২৫ লাখ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা।
বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও রাজধানীতে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনই ঢাকার বাসিন্দা।
কীটতত্ত্ব গবেষকদের আশঙ্কা, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরজুড়ে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে এডিস মশার যে নতুন প্রজনন হয়েছে, সেগুলো এখন ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে মশার ওষুধ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা এবং কীটনাশক ছিটানোর কাজে।
এর আগে ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২৭ বছরে মশার ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ছিটানোসহ সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় হয়েছে ৭৬৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। একই সময়ে মশক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছে আরও ৫০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ওই সময়েই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার বেশি।
তবে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও রাজধানীতে মশার উপদ্রব ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রশ্ন উঠেছে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম এখনো মূলত কীটনাশকনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে ওষুধপ্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
পাশাপাশি মশার ওষুধ কেনা ও প্রয়োগে অনিয়ম এবং নিম্নমানের কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, শুধু কীটনাশক ছিটানো ও ওষুধ কেনার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনাবিদ, জীববিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন। সনাতনী ওষুধনির্ভর পদ্ধতিতে থাকলে ভবিষ্যতে নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশকনিধনে ডিএনসিসি ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর আগের অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১৩১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭৫ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে চার অর্থবছরে ডিএনসিসির মশকনিধন কার্যক্রমে ব্যয় ও বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে ডিএসসিসি মশকনিধনে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৩৩ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২২ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৫ কোটি টাকা। চার বছরে ডিএসসিসির মোট ব্যয় ও বরাদ্দ প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা।
মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ড্রেন-নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছাড়া, ঝিল-লেক ও পুকুরে হাঁস ও ব্যাঙ অবমুক্ত করা, কদমগাছ রোপণ, ফিঙে পাখির মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং মশার প্রজননস্থল শনাক্তে ড্রোন ব্যবহারের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা।
কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, হাঁস, ব্যাঙ, পাখি কিংবা কদমগাছ রোপণের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ অবৈজ্ঞানিক ও কল্পনাপ্রসূত। তিনি কার্যকর কীটনাশকের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, আগস্টের শেষদিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে এবং সেপ্টেম্বরেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে এডিস মশার যে প্রজনন হয়েছে, সেগুলো এখন ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী হয়ে উঠেছে। এ কারণে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় মশকনিধন কার্যক্রম জোরদারে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে কাজ করার কথা জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়া এলাকায় নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে রোগীর আশপাশের এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তবে তাঁর মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।