
রাজধানীর গুলশানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মালিকানাধীন ফু-ওয়াং বারে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্রবিহীন ২৩০ বোতল মদ জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ দল।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চারটি বার ও রেস্তোরাঁয় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। রাতে এনবিআরের সংবাদ ব্রিফিংয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক রিজভী আহম্মেদ এসব তথ্য জানান।
ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডে অভিযানের বিষয়ে রিজভী আহম্মেদ বলেন, জব্দ করা মদের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি জানান, একটি ছোট কাভার্ড ভ্যানে করে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসব পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ওই সময় অভিযানকারী দলের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে গাড়িটি আটক করেন। পরে গাড়ি থেকে ২৩০ বোতল অনুমোদনবিহীন অ্যালকোহল বা লিকার জব্দ করা হয়।
অভিযানে ‘জিনসেং’ নামের প্যাকেটজাত পণ্য এবং প্রায় এক কেজি জাফরানও জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্যের আমদানি বা ক্রয়ের বৈধ কাগজপত্রও প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি বলে জানান তিনি।
ফু-ওয়াং ছাড়াও রাজধানীর ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট, তেজগাঁওয়ের হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনালের হলিডে ইন এবং উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জে অভিযান চালানো হয়।
এনবিআর জানায়, রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ এবং অনুমোদনহীন পণ্য মজুদের বিরুদ্ধে চলমান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), মূসক নিরীক্ষা এবং ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন। তাদের সহায়তা করে এসআরবি ও আনসার সদস্যরা।
ফু-ওয়াং বারে অভিযান চালানোর সঙ্গে সালমান মুক্তাদিরের পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সিআইআইডির অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়নি।
তিনি জানান, দাপ্তরিক তথ্য, বিভিন্ন রিপোর্ট এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে চোরাচালানের মাধ্যমে আনা বা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
রিজভী আহম্মেদ বলেন, অভিযানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা কনটেন্ট ক্রিয়েটর মুখ্য বিষয় নয়।
উত্তরার মার্গারিটা লাউঞ্জে অভিযান চালিয়ে ৬০৮ লিটার মদ পাওয়ার কথাও জানানো হয় সংবাদ ব্রিফিংয়ে। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব মদের বৈধ অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
জব্দ করা মদের মধ্যে ৩৬ লিটার দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ছিল। ওই পণ্যের ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্রও যথাযথভাবে দেখানো হয়নি বলে জানান রিজভী আহম্মেদ। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি মদের পুরো চালানই অনুমোদনহীন হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন হোটেলে পরিচালিত বারের লাইসেন্স নিয়েও অভিযানে প্রশ্ন ওঠে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হোটেলের নামে নয়, ‘হাবিব হোটেল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বারটির লাইসেন্স পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রিজভী আহম্মেদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নাম ও ট্রেড নাম আলাদা হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হলে সংশ্লিষ্টরা সেই অনুমোদন দেখাতে পারেননি।
এ ছাড়া গুলশানের ‘র ক্যানভাস বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ থেকে ২৯ লিটার অনুমোদনবিহীন মদ জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডে’ অভিযান চালায় সিআইআইডি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও এসআরবি।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা মদ অনুমোদনহীন দুটি গুদামে মজুত রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় ওই দুটি গুদামের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আরও দুটি বৈধ গুদামও সিলগালা করা হয়।
এনবিআরের কর্মকর্তারা শেখ নূর ইসলামকে ওই ওয়্যারহাউজের মালিক বলে উল্লেখ করলেও ফু-ওয়াং কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে শেখ নূর ইসলাম বা তাঁর পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই।
এদিকে দেশে মদ ও বার ব্যবসায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি কানাডায় শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবারের নাগরিকত্ব এবং সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর এনবিআরের গোয়েন্দা ইউনিটগুলো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সালমান ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পর এনবিআরের চলমান তদন্ত কার্যক্রমে গতি এসেছে—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযানকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের অভিযান কোনো ব্যক্তি বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে লক্ষ্য করে নয়; তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে।