
বিএনপি সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারের পথেই হাঁটছে এবং এর পরিণতিও সেদিকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা ও বাস্তব ফলাফলের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সুস্পষ্ট সাফল্য সরকার দেখাতে পারেনি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে ‘সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। তাঁর অভিযোগ, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি, বরং গণভোটের প্রশ্নেও নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন গত ছয় মাসে হয়নি।
চলমান জ্বালানি সংকট নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি দাবি করেন, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সরকারের প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে।
পদোন্নতি, পদায়ন, ওএসডি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ পদে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন জামায়াতের এই নেতা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরিসংখ্যানে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নের তথ্য উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দেশজুড়ে মব সহিংসতার একাধিক ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতের মূল্যায়নে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনো মানুষের নাগালের বাইরে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়ছে। এতে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
ব্যাংকিং খাতেও সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্যসংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ও উচ্চ সুদের চাপ এখনো বিদ্যমান।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। এ পরিস্থিতি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকারের কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে বলে দাবি করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষণা করলেও গত ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী। গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেমেডি অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আটটি আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মধ্যপ্রাচ্য ও জ্বালানি কূটনীতি, শ্রমবাজার এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলসহ পূর্ণাঙ্গ পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বাজার সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বাভাবিক মুনাফা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে দলটি।
সরকার প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তিশালী কোনো অর্জন জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, জনগণ সরকারকে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমস্যার সমাধান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী সময়ে সরকার যদি প্রথম ছয় মাসের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।