
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন ফিলিস্তিনি অভিভাবকেরা। বিশেষ করে রামাল্লাহর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আল-মুঘাইয়ির গ্রামের পরিস্থিতি নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে তাদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে ভোর হওয়ার আগেই আল-মুঘাইয়ির বালক বিদ্যালয়ে পৌঁছান স্কুলটির ইংরেজি শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাঈম। গ্রামটির চারপাশে বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। স্কুলের চারপাশে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং শক্তিশালী করা হয়েছে প্রবেশগেট।
গত কয়েক মাসে আল-মুঘাইয়িরে সহিংসতায় ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে স্কুলটির তিন শিক্ষার্থীও রয়েছে।
তাদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী আওস আল-নাসান এপ্রিলে স্কুলগেটের বাইরে গুলিতে নিহত হয়। শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাঈম জানান, ঘটনার সময় তিনি শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ছিলেন। দুই শিক্ষার্থী দৌড়ে এসে স্কুলের দেয়ালের কাছে বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতির খবর দেয়।
ওয়াহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় গুলির ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় তার ভাই জিহাদও ইসরাইলি সেনার গুলিতে নিহত হন বলে তিনি দাবি করেন।
ওয়াহিদ বলেন, গুলির সময় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নেয় এবং মেঝেতে শুয়ে পড়ে। এ সময় স্কুল ভবনেও গুলি এসে আঘাত করে বলে জানান তিনি।
এরপর থেকে স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। গ্রীষ্মকালেও আরও দুই শিক্ষার্থী বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও গ্রামে প্রবেশের সময় ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। স্কুল থেকে সদ্য বের হওয়া ১৯ বছর বয়সী এক যুবকও নিহত হয়েছেন।
তবে এসব ঘটনার বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ‘সহিংস দাঙ্গার’ উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার, তবু কাটছে না আতঙ্ক
আল-মুঘাইয়ির গ্রামটি ক্রমেই ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিভিন্ন আউটপোস্টে ঘিরে যাচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামের প্রবেশপথে ইসরাইলি বাহিনী প্রায়ই অস্থায়ী চেকপয়েন্ট বসিয়ে চলাচল সীমিত করে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্কুলের প্রধান বাসসাম আল-আসসাফ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের চারপাশে দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেছেন এবং স্কুলগেট আরও শক্তিশালী করেছেন।
অভিভাবক হারুন বিশারা বলেন, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিতে আসার অন্যতম কারণ হলো, এতে শিশুরা মনে করে তাদের মা-বাবা পাশে রয়েছেন এবং তারা নিরাপদ।
তবে তিনি বলেন, ‘এ বছর আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা আরও বেশি শঙ্কিত। আমরা জানি স্কুলে পরিস্থিতি নিরাপদ নয়।’
স্কুলের মাঠে শিক্ষার্থীদের প্রথম সমাবেশের সময় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাদের বারবার সতর্ক করে দেওয়া হয়—কাছাকাছি ইসরাইলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের দেখা গেলে চিৎকার না করা, কাছে না যাওয়া এবং কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য।
শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর কিছুক্ষণ পরও স্কুলের জানালা দিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানান। কয়েকশ মিটার দূরে ফিলিস্তিনি জমিতে ভেড়া চরাতে দেখা যায় কয়েকজনকে। কাছেই ইসরাইলি সেনাদের অবস্থান ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
শিক্ষক ওয়াহিদ আবু নাঈম বলেন, এপ্রিলের পর থেকে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রামের আরও কাছে চলে এসেছে।
শিশুরাও হামলার ঝুঁকিতে—জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যাতে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িঘর ও জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ফিলিস্তিনিদের তাদের জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাড়ির কাছে খেলা, স্কুলে যাতায়াত, কৃষিকাজ কিংবা গবাদিপশু চরানোর সময়ও ফিলিস্তিনি শিশুরা হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরাইল ওই প্রতিবেদনকে ‘মানহানিকর প্রহসন’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আল-মুঘাইয়িরের ভেড়া খামারি সামি আবু রাহমা বলেন, জুলাইয়ের শেষ দিকে তার নয় বছর বয়সী ছেলে সালিম খামারে ভাইবোনদের সঙ্গে খেলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। গুলিটি এখনও তার হাতে রয়েছে বলে তিনি জানান।
খামারের নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে সালিমকে বসতি স্থাপনকারীদের দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করতে এবং পরে আশ্রয়ের জন্য দৌড়াতে দেখা যায় বলে তার পরিবার জানিয়েছে। এ সময় গুলির শব্দও শোনা যায়।
সামির ভাষ্য, তার ছেলেকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো ব্যক্তি এর আগে পরিবারটিকে ওই জমি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেছিল।
বসতি স্থাপনকারী সহিংসতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সচালক হাদি আল-নাসান বলেন, গত এক বছরে ইসরাইলি বাহিনীর আচরণে পরিবর্তন এসেছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। তার দাবি, ২০২৬ সালে বসতি স্থাপনকারীরা ইসরাইলি বাহিনীর আরও বেশি সুরক্ষা পাচ্ছে।
তবে বসতি স্থাপনকারী পরিষদ জানিয়েছে, ওই গুলির ঘটনায় ডিউটির বাইরে থাকা এক সেনাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরীহ মানুষ—ইহুদি বা আরব—কারও ক্ষতি হলে তারা দুঃখ প্রকাশ করে এবং আইনবহির্ভূত সহিংসতার বিরোধিতা করে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো বসতি সম্প্রদায়ের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টাও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ৩১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২০ জন ইসরাইলি নিহত ও ১২৩ জন আহত হয়েছেন বলে ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, বিভিন্ন আউটপোস্টের বিস্তার এবং হামলার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ ও শিশুদের স্কুলে যাতায়াত ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
ফলে আল-মুঘাইয়িরের মতো গ্রামগুলোতে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো এখন শুধু শিক্ষার বিষয় নয়, বরং নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিদিনের এক কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের জমি ও বসতভিটা ধরে রাখার সংকল্পের পাশাপাশি সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন ফিলিস্তিনি অভিভাবকেরা।