
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: টানা ভারী বৃষ্টিতে আবারও পানির নিচে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সড়ক। সোমবার সকাল থেকেই নগরীর আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও রাহাত্তারপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।
সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৮১ মিলিমিটার। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, লঘুচাপের প্রভাব ও মৌসুমি বায়ুর কারণে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও এর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। ১২ বছর ধরে চট্টগ্রামে রিকশা চালানো মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘এই ১২ বছরে দেখতেছি সরকার কাজ করছে। তারপরও জলাবদ্ধতা কমে না। এত টাকা খরচ করে তাহলে লাভ কী?’
সোমবার সকালে আগ্রাবাদ ও পাঠানটুলী এলাকায় হাঁটুপানি ঠেলে চলাচলের সময় ইব্রাহিমের মতো ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরও অনেকে। বৃষ্টির পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, পথচারী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
পাঠানটুলীর বাসিন্দা সাজ্জাদ রাকিব বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। সারাবছর উন্নয়নকাজ চললেও বৃষ্টি হলে আবার একই অবস্থা। ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক রাস্তাও ভাঙাচোরা। এভাবে চলতে থাকলে শহরটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে।’
অফিসগামী রকি হায়দার বলেন, ‘দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? অফিসে আসতে হয়েছে প্যান্টের বদলে লুঙ্গি পরে। এই ভোগান্তির শেষ কবে হবে, তা আমরা জানি না।’
ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, আমাদের অফিসে যেতে হয়। বাসার নিচে পানি, অফিসের নিচেও পানি। রাস্তায় কোমরসমান পানি। উন্নয়ন করে কী লাভ, যদি মানুষের চলাচলের পথই পানির নিচে থাকে?’
রোববার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে সোমবার সকালেই নগরীর অনেক সড়কে পানি জমে যায়। বহদ্দারহাট, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজুদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও রাহাত্তারপুল এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি দেখা গেছে।
জলাবদ্ধতার কবল থেকে বাদ যায়নি আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারও। ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে পানি জমে যায়। কোথাও ওপর থেকে নিচে ঝরনার মতো পানি পড়তে দেখা গেছে।
রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন বলেন, ‘রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে বের হয়ে দেখি রাস্তায় পানি আরও বেড়েছে। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষায় একই সমস্যা হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।’
বাকলিয়ার বাসিন্দা ফকরুল আলম বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তায় অনেক পানি পেয়েছি। গাড়িও কম ছিল। ফলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে অনেক বেশি সময় লেগেছে। বৃষ্টির সঙ্গে যানবাহনের সংকট থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।’
বহদ্দারহাট এলাকার চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও কঠিন। শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই পানি মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।’
এদিকে নগরীতে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাবও পড়েছে গণপরিবহনে। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামেনি। ফলে একদিকে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে যানবাহনের সংকট—দুইয়ে মিলে দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
শুধু নগরী নয়, চট্টগ্রামের আশপাশের উপজেলাগুলোতেও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকাতেও দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সড়কে পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই চিত্র দেখা যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। তাই দ্রুত পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ চান তারা।