
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এক বছরে নানা কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিলেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক কয়েকটি সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডাকসুর ৬৮ পৃষ্ঠার কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাবার, আবাসন ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অধিকাংশ কার্যক্রম বৈঠক, পরিদর্শন, দাবি, স্মারকলিপি, আলোচনা ও প্রস্তাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ডাকসুর দেওয়া কার্যবিবরণীতে ৩৯টি বিষয়ে মোট ৫৯৬টি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দিবস পালন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে বিবৃতি ও সংহতি, চীন সফর এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের সঙ্গে বৈঠকসহ প্রায় ১৩৭টি কার্যক্রমের উল্লেখ রয়েছে। বাকি ৪৫৯টি কাজের মধ্যে কিছু কার্যক্রম একাধিক পয়েন্ট ও সেকশনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ডাকসুর সামনে সংবাদ সম্মেলনে এক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। পরে এসব কার্যক্রমের বিস্তারিত বই আকারে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট, সিট বরাদ্দে শৃঙ্খলা এবং প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসনের বিষয়গুলো এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, আবাসনসংক্রান্ত মোট ১৭টি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হলভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন এবং প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ছারপোকা নিধন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। বৃষ্টিতে কয়েকটি হলে জলাবদ্ধতার সময় পানি নিষ্কাশন, জরুরি খাদ্য ও নিরাপদ পানি সরবরাহ, জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ এবং ভ্যানযোগে যাতায়াতের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ডাকসু নির্বাচনের ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে অস্থায়ী হোস্টেল অথবা মাসিক আবাসন ভাতার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো সিট সংকটে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছাত্রী হলগুলোতে ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’, হলভিত্তিক ‘গ্রিভেন্স রেসপন্স টিম’ ও ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেল’ গঠন, কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মচারী মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভিপি সাদিক কায়েমের বক্তব্য, আবাসন সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছিল। এমনকি হলের বাইরে সরকারি আবাসনে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে উদ্যোগটি আর এগোয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে ডাকসুর কার্যবিবরণীতে ১৫টি কাজের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চারটি দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ে চারটি বৈঠক এবং আলোচনা ও পরিদর্শনের তথ্য রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন হলে খাবারের সংকট এখনো রয়েছে।
ডাকসু নির্বাচনের ইশতেহারে পুষ্টিবিদের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর খাবারের মেন্যু প্রণয়ন, প্রতি তিন মাসে খাবারের মান পরীক্ষা, বিভিন্ন ফ্যাকাল্টিতে মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিকভাবে সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিল ভাউচার’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি। কয়েকটি এলাকায় ক্যাফেটেরিয়ার কাজ চলমান থাকলেও পুষ্টিকর খাবারের মেন্যু প্রণয়ন ও নিয়মিত খাবারের মান পরীক্ষার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসের খাবার পানির মান পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়নি। গত ২০ মে বিভিন্ন স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহের পর এক সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডাকসুর কার্যক্রমের তালিকায় এমন কয়েকটি কাজেরও কৃতিত্ব দাবি করা হয়েছে, যেগুলো ডাকসু নির্বাচনের আগেই শুরু বা সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম ক্যাম্পাসে ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু। ডাকসু এটিকে নিজেদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করলেও শাটল পরিচালনাকারী গ্রিন ফিউচার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ডাকসু নির্বাচনের প্রায় এক বছর আগে ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তির ভিত্তিতে শাটল সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্বত্বাধিকারী খালেদ হোসাইন ডাকসুর সঙ্গে এ প্রকল্পে কোনো চুক্তি বা সহযোগিতা ছিল না বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সাদিক কায়েমের বক্তব্য, শাটল চালুর ক্ষেত্রে ডাকসু যৌথভাবে কাজ করেছে এবং পরিবহন সম্পাদক বিষয়টি দেখাশোনা করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নতুন হল এবং ১০টি হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগেও ডাকসু নিজেদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডাকসু নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছিল।
সাদিক কায়েম অবশ্য দাবি করেছেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বরাদ্দের অর্থ অন্যত্র চলে যাওয়া ঠেকাতে ডাকসু কাজ করেছে। তিনি নিজে উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন বলেও জানান।
এ ছাড়া ১ হাজার ৫০০ নারী শিক্ষার্থীর আবাসন সক্ষমতার চীন-মৈত্রী হল নির্মাণের উদ্যোগও ডাকসুর কার্যক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রকল্পের প্রক্রিয়া ডাকসু নির্বাচনের আগেই শুরু হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় ডাকসু নেতাদের সম্পৃক্ততা ছিল না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজের কৃতিত্বও ডাকসুর কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তুরস্কের টিকার সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম, হাসপাতাল বেডসহ বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগের কথা এতে রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ডাকসু নির্বাচনের আগেই অনুমোদিত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা তৈরি ও তুরস্কের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আইয়ামও দাবি করেছেন, ডাকসু নির্বাচনের আগেই প্রকল্পটি অনুমোদিত ও কাজ শুরু হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ডাকসু নেতারা এর কৃতিত্ব দাবি করেন।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে ডাকসু মোট নয়টি কার্যক্রমের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈঠক, দাবি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সঙ্গে সাক্ষাৎ।
তবে ক্যাম্পাসে রেজিস্টার্ড রিকশা চালু ও নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ, ভবঘুরে উচ্ছেদসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের কিছু কার্যক্রম নিয়েও ডাকসু নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
ডাকসু নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীদের সামনে দেওয়া একাধিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
‘লাল বাস’ অ্যাপ চালুর প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। কর্মচারী মূল্যায়ন ব্যবস্থাও কেন্দ্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সাদিক কায়েম জানিয়েছেন, লাল বাসের অ্যাপ চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে এটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ ছাড়া ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ‘আর্তনাদ’ নামে আরেকটি মনুমেন্ট এবং ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কারকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃথক কমিটি গঠন করেছে।
ডাকসুর কার্যক্রমের সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের মৌলিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে আবাসন, খাবার ও নিরাপত্তাসহ মৌলিক সংকটগুলো সমাধানে ডাকসু কাজ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসন সংকট নিয়ে চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।
খাবারের দাম কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, টিসিবির সঙ্গে বৈঠক ও সমঝোতা করা হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীরা কম দামে পণ্য পেতে পারেন। তবে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উদ্যোগটি এগোয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
নিরাপত্তার বিষয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখে ট্যাগ ব্যবস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলেও তা পরে আটকে যায়। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা গেটের জন্য স্পন্সর আনার কথাও জানান তিনি। তার মতে, ডাকসুর দায়িত্ব হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা—সেই কাজ তারা করেছেন।
সব মিলিয়ে, ডাকসুর এক বছরের কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক উদ্যোগ, বৈঠক ও দাবি-দাওয়ার তথ্য থাকলেও আবাসন, খাবার ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক সমস্যার কতটা স্থায়ী সমাধান হয়েছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।