রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসে নিজ দেশে ফেরার আকুতি শরণার্থীদের
Reporter Name
Update Time :
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
৮৭
Time View
রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসে নিজ দেশে ফেরার আকুতি শরণার্থীদের
উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের ভয়াবহ সেই ঘটনার স্মরণে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পালিত হয়েছে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’।
দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে গণহত্যার বিচার, নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা।
সকাল থেকেই টেকনাফের শালবাগানসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিভিন্ন স্লোগান নিয়ে জড়ো হন রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কয়েকটি ক্যাম্পেও পৃথক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে নারী, শিশুসহ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন। তাদের বক্তব্য ও স্লোগানে বারবার উঠে আসে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার আকুতি।
টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পে সকাল ৯টায় রোহিঙ্গা সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর) আয়োজিত সমাবেশ শুরু হয়। কর্মসূচির শুরুতে রোহিঙ্গা মৌলভী মো. ইউছুপ নিজ ভাষায় তারানা পরিবেশন করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন ও নিপীড়নের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতা ও ইউসিআরের সদস্য আবু তাহের বলেন, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকারের যেকোনো দাবির বিপরীতে ঐতিহাসিক ও নথিভুক্ত প্রমাণ উপস্থাপনের কথাও বলেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার কার্যকর ও নিরাপদ কোনো পথ এখনো তৈরি হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
টেকনাফের আরেক রোহিঙ্গা নেতা বদরুল ইসলাম বলেন, ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের জন্য আনন্দের দিন নয়, বরং শোক ও বেদনার দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তিনি এসব ঘটনার বিচার দাবি করেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেদা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন তারা। এখন তারা নিজেদের জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান। তবে প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করে।
উখিয়ার আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, বাংলাদেশে শরণার্থী জীবনের নয় বছর কেটে গেছে। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিজ দেশে নিরাপদ পরিবেশে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচিকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
১৬-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ কাউছার সিকদার জানান, তার আওতাধীন বিভিন্ন ক্যাম্পে শান্তিপূর্ণভাবে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি পালন করেছেন রোহিঙ্গারা। কর্মসূচিতে তারা শরণার্থী জীবনের অবসান, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।
নয় বছর ধরে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে বসবাস করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। ফলে প্রতি বছর গণহত্যা দিবসে নিজেদের হারানো অধিকার, নিরাপত্তা এবং মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি নতুন করে তুলে ধরছেন তারা।