
নাটোর (বড়াইগ্রাম), প্রতিনিধি:
মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একটি প্রজন্মকে বিপথে ঠেলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়—পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক ঘটনা স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রামে চার মাদকাসক্ত যুবককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রামে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে ১১৫ পিস ইয়াবা জব্দ এবং তিনজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া গত জুনে বড়াইগ্রামের জোনাইল বাজারে মাদক ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনের দাবিতে স্থানীয়দের মানববন্ধনের খবরও প্রকাশিত হয়।
এসব ঘটনা বলে দেয়, মাদক শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়; এটি এখন সামাজিকভাবে মোকাবিলা করার বিষয়।
মাদকের কারণে ধ্বংস হচ্ছে পরিবার
মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, অর্থনৈতিক সংকট বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ ও সহিংসতার পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
সম্প্রতি বড়াইগ্রামে মাদকাসক্ত এক সন্তানের বাবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে নিজের ছেলের কারাদণ্ড চেয়েছেন—কারণ মাদকাসক্তির কারণে পরিবারটি চরম দুর্ভোগে পড়েছিল বলে তিনি জানান।
একজন সন্তানের মাদকাসক্তি যে একটি পুরো পরিবারকে কতটা অসহায় করে দিতে পারে, ঘটনাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত।
তরুণদের টার্গেট করছে মাদক ব্যবসায়ীরা
কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ কৌতূহল, বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনা, হতাশা, বেকারত্ব কিংবা ভুল সঙ্গের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। একবার আসক্ত হয়ে গেলে অনেকের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই কোনো তরুণের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাকে অপমান বা মারধর না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
শুধু মাদকসেবী নয়, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা জরুরি
মাদক প্রতিরোধে ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা জরুরি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নীতিগত কার্যক্রমেও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের উৎস ও সরবরাহকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এবং আইনানুগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
পরিবার থেকেই শুরু হোক প্রতিরোধ
মাদক প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পরিবারের। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে। তবে অযথা সন্দেহ বা কঠোর শাসনের পরিবর্তে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং তার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে তরুণদের
তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে এলাকায় খেলার মাঠ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পাঠাগারের কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে বেকার তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ দিতে হবে। কর্মহীন ও হতাশ তরুণদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত করা গেলে মাদক ও অপরাধ থেকে তাদের দূরে রাখার সুযোগ বাড়বে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতা প্রয়োজন
বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত মাদকবিরোধী সভা, আলোচনা, বিতর্ক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি করা যেতে পারে।
শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ছোট বয়স থেকেই মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক ধারণা দিতে হবে।
মাদকাসক্তকে ঘৃণা নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগেও চিকিৎসার পর সুস্থ ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে মাদক বিক্রেতা ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং আসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।
জোনাইলসহ প্রতিটি এলাকায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে
বড়াইগ্রামের ৩ নং জোনাইল ইউনিয়নসহ প্রতিটি ইউনিয়ন, গ্রাম ও বাজার এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে নিয়মিত সভা করে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গোপনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো যেতে পারে। কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়—এ বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।