
রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে হকারদের ব্যবসা পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনতে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। নিবন্ধিত হকারদের নির্ধারিত স্থান ও সময়ের মধ্যে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম।
তিনি বলেন, হকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পথচারী ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও পথচারীবান্ধব নগরী গড়ে তোলাই প্রস্তাবিত হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার মূল লক্ষ্য।
নগর ভবনে হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিদের সামনে প্রস্তাবিত নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, নিবন্ধিত প্রত্যেক হকারকে পরিচয়সংবলিত স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স দেওয়া হবে। এতে বারকোড ও কিউআর কোড থাকবে। ফলে ট্রাফিক পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজেই লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করতে পারবে।
নিবন্ধন সনদে হকারের ব্যবসার ধরন, নির্ধারিত জোন বা অবস্থান, স্টলের আয়তন, ব্যবসা পরিচালনার সময় এবং মাসিক ফি উল্লেখ থাকবে। বরাদ্দকৃত স্থান অন্য কেউ দখল করতে পারবে না। একই সঙ্গে ওই স্থান ব্যবহারের নামে হকারদের কাছ থেকে কেউ চাঁদা দাবি করতে পারবে না।
লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য হবে না। কোনো হকার ব্যবসা ছেড়ে দিতে চাইলে সিটি করপোরেশনকে জানাতে হবে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করা যাবে না। নির্ধারিত আকারের বাইরে স্টল বা ভ্যান বড় করা কিংবা বরাদ্দের অতিরিক্ত জায়গা দখল করাও নিষিদ্ধ থাকবে।
নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট হকারকে সতর্ক করা থেকে শুরু করে নিবন্ধন বাতিল পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, হকার নিবন্ধনের জন্য এককালীন ৫ হাজার টাকা এবং প্রতি বছর নবায়ন ফি হিসেবে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের জায়গা ব্যবহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি হকারের কাছ থেকে মাসে ৩ হাজার টাকা ফি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রশাসক জানান, আবেদন পাওয়ার এক মাসের মধ্যে জায়গা খালি থাকা সাপেক্ষে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক। একটি পরিবারের জন্য একটি লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিবন্ধিত হকারদের হালনাগাদ তালিকা ডিএসসিসির ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হবে। তালিকায় হকারের নাম, পরিচয়, ঠিকানা, ব্যবসার ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে।
ডিএসসিসির মতে, এভাবে তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে নিবন্ধিত হকারদের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পথচারীদের চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক বলেন, হকার বসানোর ক্ষেত্রে এমন জায়গা নির্বাচন করা হবে, যেখানে হকার বসার পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা খালি থাকে।
প্রধান সড়কে হকার বসানো যাবে না। মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকেও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে যানজট ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও সরকারি ছুটিতে নির্দিষ্ট স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব মার্কেটে খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকায় অফিস সময়ের পর ‘নৈশকালীন মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। দিনের বেলায় ব্যস্ত থাকলেও রাতে তুলনামূলক ফাঁকা থাকে—এমন বাণিজ্যিক এলাকার নির্দিষ্ট লেন এ জন্য বিবেচনা করা হবে।
হলিডে ও নৈশকালীন মার্কেটের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে পথচারী ও যান চলাচলে যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ও নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ, উপাসনালয়ের মাঠ ও কবরস্থানে কোনো ধরনের মার্কেট বসানো যাবে না বলেও জানান প্রশাসক।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, জনস্বার্থ ও নগর উন্নয়নের প্রয়োজনে কোনো এলাকাকে হকারমুক্ত ঘোষণা করা হলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আবাসিক এলাকায় হকার বসানোও নিরুৎসাহিত করা হবে।
একই সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন হকারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে।
খাদ্য বিক্রেতা হকারদের ক্ষেত্রে বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাদ্য প্রস্তুত ও বিক্রি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া খাবার বিক্রির সুযোগ থাকবে না।
হকার ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সমন্বয়ে আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার হকারদের বিভিন্ন বিষয় স্থানীয় পর্যায়েই সমন্বয়ের মাধ্যমে দেখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে হকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের এই ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রশাসক।
মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত নিবন্ধন ও মাসিক ফি কমানোর দাবি জানান। পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসন, সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ ফুটপাতে হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা।
হকার নেতারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা হকারদের সঠিক তালিকা তৈরি এবং উপযুক্ত স্থানে পুনর্বাসনের দাবি জানান। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও জুরাইন এলাকার হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, হকার ও নগরবাসী—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করে মানবিক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে চায় সিটি করপোরেশন। প্রস্তাবিত নীতিমালার মাধ্যমে একদিকে হকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম, সম্পাদকীয় কার্যালয়-আজিজ ভবন নিচতলা, ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। ০১৭৭৭-৭৭৭০৮২, ০১৩৩৫-১৬২০০০
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২6